সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: সময়, সমাজ ও সাহিত্যের এক অনন্য নির্মাতা

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: সময়, সমাজ ও সাহিত্যের এক অনন্য নির্মাতা

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ‍্যায়।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের সাহিত্য সম্রাট। বাংলা সাহিত্যের ঊষর ভূমিতে তিনি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখনকার দিনে আমরা যার নাম শুনলেই বঙ্কিম দৃষ্টিতে অর্থাৎ একটু বাঁকা চোখে তাকাই। আজ থেকে ১৮২ বছর আগে ১৮৩৮ সালের ২৬ জুন তাঁর জন্ম পশ্চিমবাংলার নৈহাটিতে। এখন তাঁকে ঘিরে হয়তো কোন জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান হবে না। কিছু দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার সাপ্তাহিক আয়োজনে দু-একটা লেখা প্রকাশ হবে। সেই লেখা পড়তে পড়তে কেউ কেউ ঘাড় ঘুরিয়ে বুক সেল্ফের দিকে তাকিয়ে দেখবেন। সেল্ফে বই আছে, কিন্তু পড়া হয়নি। পড়ব পড়ব করেও পড়া হয়ে ওঠেনি। না, বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের পড়তেই হবে এমন কোন দিব্যি কেউ দেয়নি। না পড়লেও এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখালেখি নিয়ে আমাদের কিছু প্রচলিত ধারণা আছে। বঙ্কিমের লেখার ভাষা দুর্বোধ্য, বঙ্কিম সাম্প্রদায়িক, বঙ্কিম ইংরেজ সরকারের সেবাদাস ছিলেন। এসব বিষয় জানার জন্যই বঙ্কিমের লেখা পড়া দরকার। সেই দরকারি কাজটা আমাদের হয়ে ওঠে না। শুধু আমাদের কেন, এমন গল্পও প্রচলিত আছে, যিনি বঙ্কিমের বই সম্পাদনা করেছেন, তারও নাকি সব লেখা পড়া হয়নি। তবে একটা সময় ছিল যখন বঙ্কিম সাহিত্য পড়া হতো। রবীন্দ্রনাথ নিজে পড়তেন। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের চরিত্ররা পড়ত। বঙ্কিমের সময়কালেই রবিঠাকুরের আগমন ঘটেছে। উনিশ শতকের ষাট-সত্তরের দশকে যখন বঙ্কিমের উপন্যাসগুলো প্রকাশ হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ তখন নিতান্তই বালক। তবে ছোটবেলা থেকেই বালক রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের বঙ্গদর্শন পত্রিকা পড়তেন।

বঙ্কিম ব্রিটিশ সকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টরের চাকরি করতেন। তার লেখায় ইংরেজপ্রীতির অনেক নজির খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে এ কথাও তো আমাদের স্বীকার করতে হবে, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের মূলমন্ত্র বন্দেমাতরম - এর স্রষ্টাও বঙ্কিমচন্দ্র। এই বন্দেমাতরম খ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠের জন্য তাকে অনেক মাশুলও দিতে হয়েছে। এখন আমরা তার এই বন্দেমাতরম-এর ভেতরেও সাম্প্রদায়িক গন্ধ খুঁজি।

একটি অন‍্য ঘটনার কথা বলা যাক। বেরা, একটি উৎসব। একেবারে মুর্শিদাবাদের নিজের ব্যাপার। অন্য কোনও কারণ না ঘটলে, প্রতি বছর ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার, এই উৎসব বেশ সাড়ম্বরে পালিত হয় মুর্শিদাবাদে। ১৮৭০ সালে এই উৎসবে কিন্তু বেশ একটা মৌলিক পরিবর্তন ঘটে যায়। সৌজন্যে এক বিখ্যাত বাঙালি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

বঙ্কিম বহরমপুরে বদলি হয়ে এসেছিলেন ১৮৬৯-র ২৯ নভেম্বর (মতান্তরে ১৫ ডিসেম্বর ১৮৬৯)। অর্থাৎ, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর। পরে অবশ্য এখানে তাঁর পদন্নোতি হয়, অন্য দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়। তবে আলোচ্য সময়ে তিনি ওই একই পদে আসীন। প্রতি বারের মত সে বারেও নবাব পরিবারের পক্ষ থেকে বেরায় আমন্ত্রণ জানানো হল জেলার সরকারি আমলাদের। বঙ্কিমচন্দ্র কিন্তু আমন্ত্রণ পত্র ফিরিয়ে দিলেন। কারণ তিনি শুনেছিলেন এই উৎসবে আমন্ত্রিত অভ্যাগতদের মধ্যে শুধু সাহেবরাই নবাব প্রদত্ত জরিমানা দ্বারা উৎসব মঞ্চে বৃত হন। নবাব পরিবারের কর্মচারীকে বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, যেখানে আপ্যায়নে এই বৈষম্য সেখানে তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে অপারগ।

ব্যাপারটা এখানে থেমে থাকল না। নবাব পরিবারের উঁচু মহলে রীতিমতো আলোচনা শুরু হল। এর পর তাঁদের তরফ থেকে বঙ্কিমচন্দ্রকে আবার আমন্ত্রণ জানিয়ে বলা হল, এখন থেকে এ ধরনের পক্ষপাত ও বৈষম্যমূলক আচরণ ঘটবে না। সে দিন বেরা উৎসবে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিবাদ এ ভাবেই দেশীয় অভ্যাগতদের জন্য বহন করে নিয়ে এসেছিল সমানাধিকার এবং সমমর্যাদা। বহরমপুরে থাকাকালীন মর্যাদার প্রশ্নেই বঙ্কিমচন্দ্রকে আরও এক বার বেশ বড়সড় লড়াই করতে হয়েছিল। শীতের অপরাহ্ন সে দিন। বঙ্কিমচন্দ্র পাল্কিতে ফিরছিলেন কোর্ট থেকে ব্যারাকের মাঠের পাশ দিয়ে। মাঠে ক্রিকেট খেলছিলেন গোরা সাহেবেরা। বঙ্কিমচন্দ্রের পাল্কির এক দিকের দরজা বন্ধ ছিল। হঠাৎ সেই বন্ধ দরজায় সজোরে করাঘাত। বঙ্কিম পাল্কি থেকে লাফিয়ে নেমে এক সাহেবকে দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘Who the Devil you are?’ সাহেবটি ছিলেন সেনা দলের অধ্যক্ষ। নাম কর্নেল ডাফিন। বঙ্কিমচন্দ্রের চিৎকারে ডাফিন কোনও কথা না বলে তাঁর হাত ধরে দূরে সরিয়ে দিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র মাঠে গিয়ে পরিচিত বেনব্রিজ সাহেবকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘Have you seen how I have been dealt with by that person?’ কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রকে হতাশ করে বেনব্রিজ সাহেব জানালেন, ‘O Babu, I am short sighted, I have not seen anything.’ বঙ্কিমচন্দ্র অন্য সাহেবদেরও শুধোলেন কেউ কিছু দেখেছেন কিনা। সকলেই দেখার কথা অস্বীকার করলেন।

পরদিন কোর্টে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র ডাফিনের নামে মানহানির মামলা করলেন। কোর্টের প্রায় দেড়শো উকিল মোক্তার স্বেচ্ছায় তাঁর ওকালতনামায় সই করলেন। ডাফিন মামলা চালাতে গিয়ে কোনও উকিল মোক্তার পেলেন না। অগত্যা মধ্যস্থতা করবার জন্য ডাফিন ডিস্ট্রিক্ট জজ বেনব্রিজ সাহেবের শরণাপন্ন হলেন। বেনব্রিজ বললেন, মধ্যস্থতা তিনি করতে পারেন যদি কর্নেল বঙ্কিমবাবুর কাছে ক্ষমা চান। ডাফিনের তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। প্রকাশ্য আদালতে বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে ডাফিন বললেন, ‘আপনার যে হাত ধরে আমি আপনাকে সরিয়ে দিয়েছিলাম, সেই হাত ধরে ক্ষমা চাইছি। আমাকে ক্ষমা করুন।’ ক্ষমা করলেন বঙ্কিমচন্দ্র, তুলে নিলেন মামলা। শোনা যায় ডাফিনের পরাজয়ের দৃশ্য দেখবার জন্য সে দিন আদালতে নাকি লোক ভেঙে পড়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র বহরমপুরে ছিলেন প্রায় পাঁচ বছর। নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনা মতো কাজ করতে গিয়ে তিনি কমিশনারের নির্দেশ লঙ্ঘন করতেও পিছপা হননি। তাঁর জনপ্রিয়তাও প্রচুর ছিল। তাঁর বদলি ঠেকাতে বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রায় দেড়শো আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট ও কমিশনার এই সব আবেদনপত্র দেখে বঙ্কিমচন্দ্রের বদলি রুখে দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেই স্বাস্থ্যের কারণে বহরমপুরে থাকতে চাইছিলেন না। বদলির আবেদনও তিনি নিজেই করেছিলেন। তাই শেষ পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্রকে আর ধরে রাখা গেল না। ছোট লাটের অফিসের সেক্রেটারিকে ধরে তিনি বারাসতে বদলি হয়ে গেলেন।

যেকোনো লেখকের লেখার মূল্যায়ন করার জন্য তার সময়টি একটি অন্যতম বিবেচ্য বিষয়। লেখক তার লেখার মাধ্যমে সময়েরই প্রতিনিধিত্ব করেন। বঙ্কিমের উপন্যাসের চরিত্রদের মুখে সময়ের নিরিখে নানা রকমের মতামত প্রকাশ পেয়েছে। আমরা অনেক সময় চরিত্রের সংলাপের একটি খণ্ডিত অংশ নিয়ে লেখককে তকমা লাগিয়ে দিই। তখন লেখকের অন্য মতগুলো আমাদের নজরে আসে না। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনী লেখক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘আনন্দমঠের সন্ন্যাসীরা মুসলমান রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হলে আমরা বলি, বঙ্কিম মুসলমান বিদ্বেষী ছিলেন। বঙ্কিম যখন উপন্যাসের শেষে মহাপুরুষের মুখ দিয়ে হিন্দু ধর্মের সুতীব্র সমালোচনা করে হিন্দু সন্তান দলের হাত থেকে রাজ্যশাসনের অধিকার কেড়ে নেন, তখন আমরা তাঁকে কি বলব? ”

বঙ্কিমের শেষ উপন্যাস ‘সীতারাম’। এই উপন্যাসে ফকির চাঁদ শাহ সীতারামের উদ্দেশ্যে বলছেন, ‘বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দু রাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারের বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দু রাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু-মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে।’

‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপসংহারে ‘গ্রন্থকারের নিবেদন’-এ বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই লিখেছেন, ‘কোন পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু-মুসলমানের কোন প্রকার তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। হিন্দু হইলেই ভালো হয় না, মুসলমান হইলেই মন্দ হয় না, অথবা হিন্দু হইলেই মন্দ হয় না, মুসলমান হইলেই ভালো হয় না। ভালো মন্দ উভয়ের মধ্যে আছে। বরং ইহাতে স্বীকার করিতে হয় যে, যখন মুসলমান এত শতাব্দী ভারতবর্ষের প্রভু ছিল, তখন রাজকীয় গুণে মুসলমান সমসাময়িক হিন্দুদিগের অপেক্ষা অবশ্য শ্রেষ্ঠ ছিল। কিন্তু ইহাও সত্য নহে যে, সকল মুসলমান রাজা সকল হিন্দু রাজা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন। অনেক স্থলে মুসলমানরাই হিন্দুর অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অনেক স্থলে হিন্দু রাজা মুসলমান অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ।’ বাঁকা চোখে এই বঙ্কিম আমাদের অদেখাই থেকে যায়। এই বঙ্কিমকে আমরা আবিষ্কার করতে পারি না।

বাংলা সাময়িকী সাহিত্যের প্রসারেও বঙ্কিমচন্দ্রের অবদান অসামান্য। তাঁর সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকার মাধ্যমে একটি নতুন লেখকগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা সাময়িকী সাহিত্যের বিষয়বস্ত্ত এবং রচনাশৈলীর দিক থেকে এক নতুন আদর্শ স্থাপন করেন। সমাচার দর্পণ, সংবাদ প্রভাকর, সম্বাদ কৌমুদী এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা রচনাশৈলীর যে ধারা সৃষ্টি করেছিল, বঙ্কিমচন্দ্র তার পরিবর্তন করে ভিন্নধর্মী সমালোচনার ধারা সৃষ্টি করেন, যদিও অতীতের মতো ধর্মীয় আলোচনা ছিল এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। হিন্দুধর্ম সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যা ‘কৃষ্ণচরিত’, ‘ধর্মতত্ত্ব’ ও ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’ নামে মনোগ্রাফ আকারে ধারাবাহিকভাবে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। তবে এ থেকে এরূপ মনে করার কোন অবকাশ নেই যে, বঙ্কিমচন্দ্র একজন হিন্দুধর্ম-প্রচারক ছিলেন। তাঁর সফল কয়েকটি উপন্যাস বঙ্গদর্শনে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র ইউরোপীয় জার্নালের মতো সমালোচনার মঞ্চ হিসেবে বঙ্গদর্শনকে তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমসাময়িক অন্যান্য অনেক সাময়িকীর মতো বঙ্গদর্শনও খুব অল্প সময়, মাত্র চার বছর (১৮৭২-১৮৭৬) স্থায়ী হয়েছিল।

বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ১২৮৭ সনের চৈত্রে ‘আনন্দমঠ’ ছাপা শুরু হয়, সেই একই পত্রিকায় তার তিন মাস আগে, অর্থাৎ পৌষ সংখ্যায় ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’ শীষর্ক প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘লোকসংখ্যা গণনায় স্থির হইয়াছে যে যাহাদিগকে বাঙ্গালী বলা যায়, যাহারা বাঙ্গালাদেশে বাস করে, বাঙ্গালাভাষায় কথা কয়, তাহাদিগের মধ্যে অর্ধেক মুসলমান’। মনে রাখবেন, এর আগে এই একই পত্রিকায় ‘বঙ্গদর্শন’-এ ১২৭৯ সনে চারটে সংখ্যা জুড়ে ছাপা হয়েছিল তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘বঙ্গদেশের কৃষক’। এবং সেই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র একই সঙ্গে হাসিম শেখ এবং রামা কৈবর্ত্ত, অর্থাৎ বাংলার মুসলমান এবং হিন্দু প্রজা, কি দুর্দশার জীবন যাপন করছে, তার সুনিপুণ ছবি আঁকেন। বাংলার কৃষকের জীবন যাপনের এই ছবি ক্যানভাসে আঁকার সময় তিনি হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ তো করেনইনি, বরং বারেবারে ‘ছয় কোটি সুখী প্রজা’ দেখার কথা বলেছেন। তাঁর নিজের কথায়, ‘দুই চারিজন অতি ধনবান ব্যক্তির পরিবর্তে’ ‘ছয় কোটি সুখী প্রজা’ দেশের মঙ্গল এবং শ্রীবৃদ্ধিকে সূচিত করবে। এবং ‘বন্দেমাতরম’-এর স্রষ্টা স্পষ্ট করে বারবার বলেছেন, এই ছয় কোটি প্রজার মধ্যে তিন কোটি হাসিম শেখ আর তিন কোটি রামা কৈবর্ত্ত। সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র একই সঙ্গে হাসিম শেখ এবং রামা কৈবর্ত্ত, অর্থাৎ বাংলার মুসলমান এবং হিন্দু প্রজা, কী দুর্দশার জীবন - যাপন করছে, তার বর্ণনা করার সময় তিনি হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেননী।

‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপসংহারে ‘গ্রন্থকারের নিবেদন’-এ বঙ্কিমচন্দ্র যে কথা বলেছিলেন, আসলে সেটাই তাঁর জীবনের, সাহিত্যকীর্তির মূল মন্ত্র। তিনি লিখেছেন, ‘গ্রন্থকারের বিনীত নিবেদন এই যে, কোন পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু মুসলমানের কোন প্রকার তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য। হিন্দু হইলেই ভাল হয় না, মুসলমান হইলেই মন্দ হয় না, অথবা হিন্দু হইলেই মন্দ হয় না, মুসলমান হইলেই ভাল হয় না। ভাল মন্দ উভয়ের মধ্যে আছে। বরং ইহাতে স্বীকার করিতে হয় যে, যখন মুসলমান এত শতাব্দী ভারতবর্ষের প্রভু ছিল, তখন রাজকীয় গুণে মুসলমান সমসাময়িক হিন্দুদিগের অপেক্ষা অবশ্য শ্রেষ্ঠ ছিল। কিন্তু ইহাও সত্য নহে যে, সকল মুসলমান রাজা সকল হিন্দু রাজা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিলেন। অনেক স্থলে মুসলমানরাই হিন্দুর অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অনেক স্থলে হিন্দু রাজা মুসলমান অপেক্ষা রাজকীয় গুণে শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণের সহিত যাহার ধর্ম আছে - হিন্দু হউক, মুসলমান হউক, সেই শ্রেষ্ঠ। অন্যান্য গুণ থাকিতেও যাহার ধর্ম নাই - হিন্দু হউক, মুসলমান হউক - সেই নিকৃষ্ট।’

রবীন্দ্রনাথের আগে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সাহিত্যের অনেকটা পথ হাতে ধরে এগিয়ে দিয়ে গেছেন। গদ্য রচনার ক্ষেত্রে নতুন ধারার সূচনা করেছেন। সূচনা করেছেন আধুনিক বংলা উপন্যাস লেখার। বাংলা ভাষার গদ্যরীতি সেই সময় রামমোহন-বিদ্যাসাগরের হাত ধরে সবেমাত্র শৈশব উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের লেখক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পশ্চাতে চারটি স্বতন্ত্র ধারা ক্রিয়াশীল ছিল। প্রথমত উনিশ শতকের শুরুতে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষীর আধুনিক চিন্তাধারার ফলে বাংলা গদ্যের বিকাশ; দ্বিতীয়ত সংবাদপত্র ও সাময়িকীর ক্রমবিকাশ; তৃতীয়ত নব্য হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং চতুর্থত কলকাতায় ইংরেজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধিকারী বুদ্ধিজীবী ও বিত্তবান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব। বঙ্কিমচন্দ্র এই ধারার স্রষ্টা নন, বরং প্রচলিত ধারারই ফল। তিনি পূর্বসূরিদের সৃষ্ট ধারার সুযোগ-সুবিধা পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করেন এবং প্রগতির ধারাকে আরও অগ্রসর করে একটা স্বতন্ত্র রূপ দিতে অনন্য অবদান রাখেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু করেন। তাঁর প্রথম দিকের বাংলা ও ইংরেজি রচনা (ললিতা, মানস, Adventures of a Young Hindu এবং Rajmohan’s Wife) পাঠক ও সাহিত্যমহলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি, বরং পরবর্তীকালে পেশাগত জীবনেই তাঁর সৃষ্টিশীল মননের বিকাশ ঘটে। মফস্বলে চাকরিরত থাকাকালে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলার প্রকৃত অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন এবং বাংলার জনগণের বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করেন। জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংসর্গ এবং তাদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া থেকে তিনি তাঁর উপন্যাসের চরিত্র গ্রহণ করেন। গভীরভাবে পাশ্চাত্য সাহিত্য অধ্যয়নের ফলে তাঁর সাহিত্য প্রতিভা শাণিত হয়েছিল এবং এর প্রভাব লক্ষ করা যায় তাঁর উপন্যাসের চরিত্র নির্মাণ ও কাহিনী বর্ণনায়।

বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন দীর্ঘ নয়। এ সময়ের মধ্যে তার সাহিত্য সাধনা বিস্ময়কর। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৩৪। ১৫ বছর বয়সে তিনি দুটি ছোট কাব্য রচনা করেন। প্রথম গদ্যরচনা ছিল ইংরেজি ভাষায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ইংরেজি উপন্যাস ‘রাজমোহন’স ওয়াইফ’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৬৮ সালে কিশোরী চাঁদ মিত্রের সম্পাদিত ‘ইন্ডিয়ান ফিল্ড’ পত্রিকায়। বঙ্কিমচন্দ্র তার সাহিত্যিক জীবনের ২২ বছরে ১৪টি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। সেগুলোর নাম: দুর্গেশ নন্দিনী (১৮৬৫), মৃণালিনী (১৮৬৯), বিষবৃক্ষ (১৯৭৩), ইন্দিরা (১৮৭৩), যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪), রাধারাণী (১৮৭৫), চন্দ্রশেখর (১৮৭৫), রজনী (১৮৭৭), কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮), রাজসিংহ (১৮৮১), আনন্দমঠ (১৮৮২), দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪) ও সীতারাম (১৮৮৭)।

এই উপন্যাস ছাড়াও তাঁর আছে ‘কমলাকান্তের দপ্তর’, ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’, ‘লোকরহস্য’, ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ এবং আরও কিছু গদ্য রচনা।

১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র প্রকাশ করেন বঙ্গদর্শন নামের সাময়িক পত্রিকা। বঙ্গদর্শন বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি এবং সাহিত্য সমালোচনা উভয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কর্মক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দিলেও তাঁর স্বদেশানুরাগ ও জাতীয়তাবোধ ব্রিটিশ শাসককে সাবধানী করে তুলেছিল। দীর্ঘ ৩৩ বছরের কর্মজীবনে এ জন্যই বঙ্কিম কখনো পদোন্নতির সৌভাগ্য লাভ করেননি। গভীর হতাশায় শেষপর্যন্ত ১৮৯১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ করেন। এরপরই দ্রুত স্বাস্থ্যহানি ঘটে। অবশেষে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে বহুমূত্র রোগে ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়।

উপন্যাস ছাড়াও বঙ্কিমের গান পাওয়া যায় ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এ। কমলাকান্ত প্রসন্নকে শুনিয়েছিলেন, ‘এসো এসো বঁধু এসো, আধ আচারে বসো…।' ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে ধনকুবের জগতশেঠ ভাইদের জলসাঘরের ঐশ্বর্যমণ্ডিত সংগীতসভায় মনিয়াবাঈকে ‘সনদি খিয়াল’ গাইতে দেখা যায়, ‘শিখো হো ছল ভালা’। অনুমান মেটিয়াব্রুজে ওয়াজেদ আলি শাহর সভাগায়ক সনদপিয়া রচিত ঠুমরি হল সনদি খিয়াল। ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের চতুর্থ খণ্ড প্রথম পরিচ্ছদে মোগল সেনার বেশে মানিকলালের গলায় বঙ্কিম রাখেন উত্তর-মধ্য ভারতের লোকভাষার একটি গান, ‘শরম ভরমসে পিয়ারী,/সোমরত বংশীধারী,/ঝুরত লোচনসে বারি…।' এ রকম উদাহরণ আরও রয়েছে বঙ্কিমের উপন্যাসে এবং লেখায়। বঙ্কিমের এই সংগীতপ্রীতি এবং সংগীত বিষয়ে গভীর ধারণা কোথা থেকে কী ভাবে হয়েছিল?

আমরা জানি বঙ্কিমের সময় হল বাংলায় রাগসংগীত চর্চার সুবর্ণ যুগ। এক দিকে মেটিয়াব্রুজে লখনউয়ের সিংহাসনচ্যুত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহর সংগীত দরবার, যার স্পষ্ট প্রভাব বঙ্কিমের ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ঊপন্যাসে বর্ণিত নবাব কতলু খাঁর নাচগানবিলাসিতার মধ্যে অনেকখানি ধরা পড়ে, অন্য দিকে পাথুরিয়াঘাটার রাজা যতীন্দ্রমোহন ও সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের গানবাজনার আসর, কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি-সহ কয়েকটি বনেদি বাড়ির সংগীতচর্চা ও বৈঠকি আড্ডা কলকাতার সেই সময়কার সংগীতচর্চাকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। প্রসঙ্গত বঙ্কিম ছিলেন সৌরীন্দ্রমোহনের খুবই ঘনিষ্ঠ। তাঁদের বাগানবাড়ি মরকতকুঞ্জে ১৮৭৬ সালের ৩১ জানুয়ারি সরস্বতী পুজোর দিন অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বার্ষিক কলেজ রি-ইউনিয়নে সৌরীন্দ্রমোহনের গান শুনতে উপস্থিত ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের কাঁঠালপাড়ার বাড়িতেও গৃহদেবতা রাধাবল্লভের নানা পার্বণ উপলক্ষ্যেও যাত্রা, পালাগান, কথকতা ইত্যাদি লেগেই থাকত। শৈশবাবস্থা থেকেই বঙ্কিম ওই সাংগীতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠায় তাঁর কান গানের জন্য যে তৈরি হয়ে উঠেছিল তা বলাই যায়। পরবর্তীকালে একটু বেশি বয়সে তিনি রীতিমতো নাড়া বেঁধে তাঁর থেকে দু’বছরের ছোটো সেই সময়ের প্রখ্যাত ধ্রুপদশিল্পী যদুভট্টের কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের অবদানের স্বীকৃতি জানিয়ে বলেছেন, ‘বঙ্গদর্শন ও বঙ্কিমের রচনায় বাংলা সাহিত্য প্রথম আধুনিক যুগের আদর্শকে প্রকাশ করেছে।’ বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের বিকাশে তাঁর অসীম অবদানের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন।

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের প্রয়াণ দিবসে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

তথ্যসূত্র :- এই সময়, আনন্দবাজার পত্রিকা, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, খবর অনলাইন, উইকিপিডিয়া।

 

Post a Comment

0 Comments