সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম শেষে এক শ্রমিক পাহাড়ি রাস্তা ধরে সাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ দূরে একটি লাল রঙের গাড়ি রাস্তার পাশে থেমে থাকতে দেখে তিনি এগিয়ে গেলেন।
গাড়ির পাশে একজন বৃদ্ধা ভদ্রমহিলা উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি আশেপাশের গাড়িগুলোর দিকে সাহায্যের আশায় তাকিয়ে ছিলেন, কিন্তু কেউ থামছিল না। কেউ তার বিপদের কথা ভাবছিল না। 😥
শ্রমিকটি সাইকেল থেকে নেমে বিনয়ের সঙ্গে বললেন,
“ম্যাডাম, আমি কি আপনাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি?”
ময়লা পোশাক আর পরিশ্রমে ক্লান্ত চেহারা দেখে প্রথমে ভদ্রমহিলার মনে একটু শঙ্কা জাগল। কিন্তু লোকটি তার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে হাসিমুখে বলল,
“আপনি গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসুন। বাইরে অনেক ঠান্ডা। আমি টায়ারটা ঠিক করার চেষ্টা করছি।”
ভদ্রমহিলা গাড়ির ভেতরে গিয়ে বসলেন। জানালার ফাঁক দিয়ে তিনি দেখছিলেন, কী নিষ্ঠা আর আন্তরিকতার সঙ্গে লোকটি কাজ করে যাচ্ছে। অনেক পরিশ্রমের পর অবশেষে সে টায়ারটি ঠিক করতে সক্ষম হলো।
তখন ভদ্রমহিলা উপলব্ধি করলেন, এই মানুষটি না থাকলে হয়তো নির্জন পাহাড়ি রাস্তায় তিনি বড় কোনো বিপদে পড়তে পারতেন।
কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি ব্যাগ থেকে ১০০০ টাকার একটি নোট বের করে লোকটির হাতে দিতে চাইলেন এবং বললেন,
“তুমি আজ আমার জন্য যা করেছ, তার মূল্য টাকা দিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তবুও এটা তোমার ন্যায্য পাওনা।”
লোকটি মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“ম্যাডাম, কাউকে সাহায্য করার বিনিময়ে আমি টাকা নিতে পারব না। তবে আপনি যদি সত্যিই আমাকে কিছু দিতে চান, তাহলে পরেরবার যখন কোনো অসহায় মানুষকে দেখবেন, তাকে সাহায্য করবেন। তখন শুধু আমার কথা একবার মনে করবেন।”
এই কথা বলে তিনি সাইকেল চালিয়ে নিজের পথে চলে গেলেন।
ভদ্রমহিলাও গাড়ি নিয়ে রওনা দিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর তিনি একটি রেস্তোরাঁয় খাবার খাওয়ার জন্য থামলেন।
সেখানে তিনি দেখলেন, এক গর্ভবতী তরুণী সবার টেবিলে খাবার পরিবেশন করছে। হঠাৎ তার হাত থেকে একটি কাঁচের পাত্র পড়ে ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ম্যানেজার ছুটে এসে তাকে কঠোরভাবে বকাবকি করতে লাগল এবং জানাল, ভাঙা পাত্রের দাম তার বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে।
দৃশ্যটি দেখে ভদ্রমহিলার মন ভারী হয়ে গেল। তিনি ভাবলেন,
“কতটা প্রয়োজন হলে একজন গর্ভবতী নারীকে এমন অবস্থায়ও কাজ করতে হয়!”
খাবার শেষ করে তিনি বিল পরিশোধ করলেন। বিদায় নেওয়ার আগে তরুণীটিকে ডেকে নিঃশব্দে তার হাতে ৫০০০ টাকা গুঁজে দিলেন।
মুহূর্তেই তার মনে ভেসে উঠল সেই শ্রমিকের কথা...
“পরেরবার কাউকে সাহায্য করবেন, আর আমার কথা মনে করবেন।”
অপ্রত্যাশিত এই উপহার পেয়ে তরুণীটি আনন্দে অভিভূত হয়ে গেল। কাজ শেষ করে দ্রুত বাড়ি ফিরল।
বাড়িতে গিয়ে দেখল, তার স্বামী রাতের খাবার তৈরিতে ব্যস্ত।
সে স্বামীর হাতে ৫০০০ টাকা দিয়ে পুরো ঘটনাটি খুলে বলল।
সব কথা শোনার পর তার স্বামী হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, ভদ্রমহিলার গাড়ির রং কি লাল ছিল?”
স্ত্রী অবাক হয়ে বলল,
“হ্যাঁ! কিন্তু তুমি কীভাবে জানলে?”
লোকটি মৃদু হেসে আকাশের দিকে তাকাল। তারপর সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল,
“আজ বাড়ি ফেরার পথে এক লাল গাড়ির টায়ার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি সেটি ঠিক করে দিয়েছিলাম...”
তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“মনে রেখো, কে ভালো কাজ করছে আর কে খারাপ কাজ করছে, সৃষ্টিকর্তা সবই দেখেন। মানুষের করা ভালো কাজ কোনো না কোনোভাবে তার কাছেই ফিরে আসে। হয়তো অন্য পথ দিয়ে, অন্য কারও হাত ধরে, কিন্তু ফিরে আসে ঠিকই।”
শিক্ষা:
ভালো কাজ কখনো বৃথা যায় না। নিঃস্বার্থভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ালে তার প্রতিদান একদিন না একদিন, কোনো না কোনোভাবে জীবনে ফিরে আসে। ❤️🙂

0 Comments