শেখার ক্ষুধা আর শেখানোর মানসিকতা

শেখার ক্ষুধা আর শেখানোর মানসিকতা

 



যে কাজের কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই, যে কাজ কখনো করিনি, সেটাই শেখার প্রতি আমার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। কী কাজে লাগবে, ভবিষ্যতে কী হবে, সেখান থেকে কোনো লাভ হবে কি না, এসব হিসাব না করেই আমি নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করি।

আমার কাছে শেখা মানে শুধু নিজের জ্ঞান বাড়ানো নয়। কেউ কোনো কিছু শেখার জন্য সাহায্য চাইলে, আমি যতটুকু জানি, উজাড় করে তাকে শেখাতে চেষ্টা করি। কাউকে কিছু শেখানোর আগে আমি কখনো ভাবি না যে, আমার জ্ঞান কমে যাবে।

কারণ আমি বিশ্বাস করি, জ্ঞান ভাগ করলে কমে না, বরং আরও সমৃদ্ধ হয়।

আমার শেখার গল্পটাও একটু ভিন্ন।

ব্লগ লেখা, ওয়েবসাইট তৈরি, ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশ করা, ভিডিও এডিটিং কিংবা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে কাজ করা, এসব আমি কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বা কারও কাছ থেকে হাতে-কলমে শিখিনি। আমার শিক্ষক ছিল মূলত ChatGPT, YouTube এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার অভিজ্ঞতা ও তথ্য।

অর্থাৎ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি নিজেই শিখেছি, নিজেই চেষ্টা করেছি, ভুল করেছি এবং আবার শিখেছি।

ভিডিও এডিটিংও নতুন করে শুরু করেছি। কিছু মানুষের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করেছিলাম। ভেবেছিলাম, যারা কাজটি ভালো জানেন তারা হয়তো অন্তত কিছু দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু অনেক সময় সেটাও পাইনি।

বরং শুনেছি, “কোর্স করতে হবে।”

কোর্স করার পরামর্শ খারাপ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই একটি ভালো কোর্স শেখার পথকে সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন কেউ নিজে থেকে শেখার আগ্রহ নিয়ে সাহায্য চাইছে, অথচ তাকে একটি সূত্র, একটি ভিডিও, একটি বই কিংবা সামান্য দিকনির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে না।

আমি অবশ্য কোর্স ছাড়াই কম্পিউটারের অনেক কাজ শিখেছি। নিজের চেষ্টায় ব্লগ সাইট তৈরি করেছি, একটি Facebook Page monetization পেয়েছি এবং বর্তমানে YouTube নিয়ে কাজ করছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমার শেখার বড় অংশ এসেছে অনুসন্ধান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিজের ভুল থেকে।

একসময় আমি একজনের কাছে VAT ও Tax-এর কাজ শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলাম। আমার মূল প্রয়োজন ছিল practical knowledge, অর্থাৎ বাস্তবে কাজটি কীভাবে করতে হয় সেটা বোঝা। তিনিও আমাকে কোর্স করার কথা বলেছিলেন। আমি কোর্সটির তথ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটাও আর পাওয়া হয়নি।

ফলে VAT ও Tax-এর কাজটি এখনো আমার কাছে অনেকটাই অজানা। কারণ বই পড়ে ধারণা পাওয়া আর বাস্তবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এক জিনিস নয়।

এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে একটি বিষয় খুব গভীরভাবে ভাবিয়েছে।

কাউকে কিছু শেখালে আপনার বিদ্যা কমে যায় না।

আপনি কাউকে একটি কাজ শেখালে আপনার জ্ঞান হারিয়ে যায় না। বরং নিজের জানা বিষয়টি অন্যকে বোঝাতে গিয়ে আপনি নিজেই আরও পরিষ্কারভাবে বিষয়টি বুঝতে পারেন। জ্ঞান ভাগ করার মাধ্যমে জ্ঞান আরও বিস্তৃত হয়।

আর আমি তো কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নই।

আমি যা জানি, তা অন্য একজন মানুষকে শেখালে সে আমার জায়গা দখল করে ফেলবে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। বরং আমার কাছে সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, আমার জানা কোনো একটি বিষয় যদি অন্য কারও কাজে লাগে।

মানুষের সবচেয়ে সুন্দর অর্জন শুধু নিজের উন্নতি নয়। নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অন্য একজন মানুষকে একটু এগিয়ে দিতে পারাও একটি বড় অর্জন।

দুঃখের বিষয়, সবাই বিষয়টিকে এভাবে দেখে না।

কিছু মানুষ জ্ঞান অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানকে পণ্যে পরিণত করে ফেলে। তাদের কাছে প্রতিটি তথ্য, প্রতিটি কৌশল, প্রতিটি অভিজ্ঞতার একটি মূল্য নির্ধারিত হয়ে যায়। ব্যবসা করা অবশ্যই খারাপ নয়। নিজের দক্ষতার বিনিময়ে আয় করাও স্বাভাবিক।

কিন্তু সবকিছুর মাঝেও মানবিকতার জায়গাটা যেন হারিয়ে না যায়।

সব জ্ঞান বিক্রি করার জন্য নয়। কিছু জ্ঞান ভাগ করে দেওয়ার জন্যও।

কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা কতটা জানি, তা নয়; বরং আমরা যা জানি, তা দিয়ে অন্য কারও কতটা উপকার করতে পেরেছি।

আমি এখনো শিখছি। প্রতিদিন নতুন কিছু শিখছি। হয়তো আগামীকাল এমন কিছু শিখব, যা আজ আমার কাছে সম্পূর্ণ অজানা।

আর আমি চাই, আমার শেখার পথটা শুধু আমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকুক।

আমি শিখব, অন্যকে শেখাব এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।

কারণ আমার কাছে জ্ঞানের প্রকৃত মূল্য তখনই, যখন তা অন্যের জীবনেও একটু আলো যোগ করতে পারে।

Post a Comment

0 Comments