একটি শক্তিশালী, উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনের মূল ভিত্তি হলো সততা, ন্যায়বিচার এবং সুশাসন। কিন্তু যখন দুর্নীতি সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রবেশ করে, তখন তা রাষ্ট্রের অগ্রগতি, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই দেশ গঠন এবং দুর্নীতি নির্মূল একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দুর্নীতি মুক্ত না হলে একটি দেশ কখনোই তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না।
দেশ গঠনের মূল ভিত্তি
দেশ গঠন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর:
১. সুশাসন প্রতিষ্ঠা
সুশাসন মানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ। যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের দায়িত্ব সৎভাবে পালন করে, তখন জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। সুশাসন নিশ্চিত করলে দুর্নীতির সুযোগ কমে যায় এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়।
২. শিক্ষার প্রসার
শিক্ষা একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল জাতি গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। শিক্ষিত মানুষ তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সক্ষম হয়। তাই শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, বরং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য।
৩. নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ
নৈতিকতা ও সততা একটি জাতির মেরুদণ্ড। যখন সমাজে সততা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন দুর্নীতির স্থান সংকুচিত হয়ে যায়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে এই মূল্যবোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
দুর্নীতি: উন্নয়নের প্রধান বাধা
দুর্নীতি একটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন এবং সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। এটি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করে, সম্পদের অপচয় ঘটায় এবং সাধারণ মানুষের অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করে।
Transparency International–এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুর্নীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অগ্রগতির অন্যতম প্রধান বাধা। দুর্নীতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয় এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন অর্জন করেছে। কিন্তু এই অগ্রগতি টেকসই করতে হলে দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
দুর্নীতি নির্মূলে করণীয়
দুর্নীতি নির্মূল করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর জন্য সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
১. আইনের কঠোর প্রয়োগ
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন এবং তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতিবাজদের দ্রুত বিচার এবং উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করলে অন্যরা দুর্নীতি করতে নিরুৎসাহিত হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এই প্রতিষ্ঠানকে আরও স্বাধীন, শক্তিশালী এবং কার্যকর করতে হবে।
২. প্রশাসনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি
সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। অনলাইন সেবা, ই-গভর্নেন্স এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
৩. জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
প্রতিটি সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন করা উচিত।
৪. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনগণ যদি দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে ঘৃণা করে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, তাহলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে।
৫. ব্যক্তিগত সততা
দুর্নীতি নির্মূলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ব্যক্তিগত সততা। যদি প্রতিটি ব্যক্তি নিজ নিজ দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করে, তাহলে দুর্নীতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে।
তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা
তরুণরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তারা যদি সততা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসে, তাহলে একটি দুর্নীতি মুক্ত দেশ গঠন সম্ভব। তরুণদের উচিত:
- অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন হওয়া
- নিজ নিজ কাজে সততা বজায় রাখা
- সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করা
জাতির পিতার আদর্শ
শেখ মুজিবুর রহমান একটি সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে থাকবে ন্যায়, সমতা এবং সততা। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে আমাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
উপসংহার
দেশ গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং একটি সৎ, সচেতন এবং দায়িত্বশীল জাতি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। দুর্নীতি নির্মূল ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
প্রতিটি নাগরিক যদি নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এবং নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করে, তাহলে একটি শক্তিশালী, উন্নত এবং দুর্নীতি মুক্ত দেশ গঠন করা সম্ভব।
দেশ পরিবর্তন শুরু হয় ব্যক্তি থেকে। তাই আজ থেকেই আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে সততা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি উন্নত, মর্যাদাপূর্ণ এবং আদর্শ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারব।

0 Comments